ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, নাটোরের চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী ২৮ প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ছাড়া কেউ কখনো এমপি নির্বাচিত হননি। আবার মাত্র ৫ জন ছাড়া সবাই এবারই প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। প্রার্থীদের মধ্যে অর্ধেকই কোটিপতি। প্রায় সবাই উচ্চশিক্ষিত। এর মধ্যে একজন অষ্টম শ্রেণি পাশ ও অন্য তিনজন মাধ্যমিক পাশ। বাকি সবাই কমপক্ষে ডিগ্রি পাশ। রয়েছেন ডক্টরেট ডিগ্রিধারী প্রার্থীও। অধ্যাপক, চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী ও সাংবাদিকসহ নানা পেশায় নিযুক্ত রয়েছেন এই ২৮ প্রার্থী। এর মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর আগে অংশ নিয়েছেন-নাটোর-২ আসনের এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি, জামায়াতের অধ্যাপক মো. ইউনুস আলী, নাটোর-১ আসনের আনসার আলী ও নাটোর-৩ আসনের দাউদার মাহমুদ।
মন্ত্রীপুত্র রাজনের ১২০ ভরি স্বর্ণের দাম এক লাখ টাকা: নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থীর কমবেশি স্বর্ণ থাকলেও নাটোর-১ আসনের প্রার্থী প্রয়াত ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের ছেলে লালপুর থানা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইয়াসিন আরশাদ রাজনের রয়েছে সর্বোচ্চ ১২০ ভরি স্বর্ণ। ৪৫ বছর বয়সি এই চিকিৎসক তার হলফনামায় এসব স্বর্ণ উপহার হিসাবে পেয়েছেন উল্লেখ করে এর আনুমানিক মূল্য লিখেছেন এক লাখ টাকা। ঢাকার বনশ্রীতে তার দোতলা দুটি বাড়ি রয়েছে। সাভারে জমি রয়েছে। তার স্থাবর-অস্থাবর ৫ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। তার আপন ছোট বোন একই আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফারজানা শারমিন পুতুলের হাতে নগদ রয়েছে এক কোটি ৭৯ লাখ ৫৪ হাজার ৯৫২ টাকা।
তার থাকা ৫০ ভরি স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য দেখানো হয়েছে ৫ লাখ টাকা। পৈতৃকসূত্রে ঢাকার বনানীতে পুতুলের ৫ কাঠা জমির ওপর ৫ তলা বাড়ি রয়েছে। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুর নগদ তিন লাখ ১০ হাজার ও ব্যাংকে এক হাজার ৮২২ টাকা রয়েছে। তার স্ত্রীর নগদ ৩৩ লাখ ১৮ হাজার এবং ব্যাংকে ১০ লাখ ১১ হাজার টাকা রয়েছে। স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে তার তিন কোটি ১১ লাখ টাকার সম্পদ আছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা ১৫টি মামলার মধ্যে ১১টি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং চারটি থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন।
সম্পদ, মামলা ও নির্বাচনে দুলুই শীর্ষে: জেলার চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব প্রার্থীর বিরুদ্ধেই কমবেশি মামলা রয়েছে। তবে নাটোর-২ (সদর-নলডাঙ্গা) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুই মামলা, সম্পদ ও নির্বাচনে শীর্ষে রয়েছেন। দুলুর বিরুদ্ধে গত ২০ বছরে সবচেয়ে বেশি ৮৩টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ৪৪টি থেকে তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেলেও এখনো তার বিরুদ্ধে ৩৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। দুলুর নগদ অর্থ রয়েছে এক কোটি ৭৪ লাখ ৯৫ হাজার ৮০৪ টাকা। তাদের স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ব্যাংকে ৪৭ লাখ করে টাকা রয়েছে। স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে দুলুর সম্পদ রয়েছে ৭ কোটি ৬২ লাখ ৫৬ হাজার ৮৪১ টাকার। তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ছবির সম্পদ রয়েছে ৮ কোটি ১৮ লাখ ১৬ হাজার ৮৭২ টাকার। চলতি অর্থবছরে এই দম্পতি আয়কর দিয়েছেন ৫৯ লাখ ৩ হাজার ২০২ টাকা। দুলুর গুলশানে ফ্ল্যাট ও নাটোরে বাড়ি ছাড়াও গ্রামে রয়েছে ২০ বিঘার পুকুরসহ ৪০ বিঘা জমি। তার পরিবারে দুটি গাড়ি রয়েছে। প্রার্থীদের মধ্যে তারই একমাত্র লাইসেন্সকৃত একটি পিস্তল ও একটি রাইফেল রয়েছে। জেলার প্রার্থীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই এমপি ও মন্ত্রী ছিলেন।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মো. ইউনুস আলীর বিরুদ্ধে ৯টি মামলা হয়। তার ব্যাংকে কোনো টাকা নেই। তিনি কোনো আয়কর দেন না। অবসরপ্রাপ্ত এই কলেজ শিক্ষকের নগদ টাকা রয়েছে ২৬ লাখ ৮৭ হাজার ৩৯০। তার দুটি টিনশেড বাড়ি ও স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে ২৮ লাখ ৪১ হাজার টাকার সম্পদ রয়েছে। এই আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা মোহাম্মদ আলীর স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে এক কোটি টাকার সম্পদ, জাতীয় পার্টির মো. রকিব উদ্দিন কমলের নগদ ৫০ হাজার ও ব্যাংকে ১০ হাজার টাকা এবং গণসংহতি আন্দোলনের তাহামিদা ইসলাম তানিয়ার ২১ লাখ টাকার গহনা ও ৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকার সম্পদ রয়েছে।
নাটোর-৩ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই কোটিপতি: নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী তিন কলেজ শিক্ষকের মধ্যে বিএনপির অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলামের নগদ দুই লাখ ২১ হাজার ও ব্যাংকে ৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকা রয়েছে। তার সম্পদ রয়েছে এক কোটি ৫৭ লাখ ৩০ হাজার টাকার। জামায়াতের প্রার্থী সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সাইদুর রহমানের নগদ টাকা রয়েছে ৬০ লাখ ৪৬ হাজার। সম্পদ রয়েছে এক কোটি ২৫ লাখ ১০ হাজার টাকার। এই আসনে এনসিপির প্রার্থী অধ্যাপক এএসএম জার্জিস কাদিরের হাতে নগদ টাকা আছে এক কোটি ১২ লাখ ৩৭ হাজার। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা খলিলুর রহমানেরও ৯০ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক দাউদার মাহমুদের রয়েছে দুই কোটি টাকার সম্পদ।
জামায়াত প্রার্থীর বাড়ি না থাকলেও আছে গাড়ি: নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে জামায়াতের মাওলানা মো. আব্দুল হাকিমের নিজস্ব কোনো বাড়ি না থাকলেও তার একটি গাড়ি রয়েছে। বাবার বাড়িতে বসবাস করা আব্দুল হাকিমের প্রায় আট লাখ টাকা দামের একটি মাইক্রোবাস রয়েছে, যা দিয়েই তিনি চলাফেরা করেন। তার হাতে নগদ টাকা রয়েছে ৯ লাখ ১৩ হাজার ও ব্যাংকে রয়েছে ৪৯ হাজার টাকা। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির আব্দুল আজিজের হাতে নগদ ২০ হাজার ৫৪৮ ও ব্যাংকে ১২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা রয়েছে। তার স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে তিন কোটি ৯৫ লাখ ২৭ হাজার টাকার সম্পদ রয়েছে। তার ৮ কক্ষের একটি বাড়ি রয়েছে। জেলার মধ্যে এই আসনে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা ছিল সবচেয়ে কম। এর মধ্যে জামায়াতের আব্দুল হাকিমের বিরুদ্ধে একটি মামলা হলেও সেটা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বিএনপির আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে তিনটি মামলার দুটি স্থগিত ও একটি থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন।
