শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ছুরিকাঘাতের পর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া ফ্লেক্সিলোড ও ওষুধ ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাস (৪৮) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
শনিবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকার জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বুধবার রাতে ছুরিকাঘাতের পর হামলাকারীদের চিনে ফেলায় তারা শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়। এদিকে হত্যার ঘটনায় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ডামুড্যা থানায় তিনজনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
আসামিরা হলেন-কনেশ্বর এলাকার সোহাগ খান (২৭), রাব্বি মোল্লা (২১) ও পলাশ সরদার (২৫)। পুলিশ সোহাগ ও রাব্বিকে না পেয়ে তাদের বাবাদের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এদিকে হিন্দু ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে মিথ্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়েছে নিহত খোকনের পরিবার।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, খোকন চন্দ্র দাস প্রায় তিন দিন ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শনিবার সকালে তিনি মারা যান। তার শরীরের ৩০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। মুখমণ্ডল ও শ্বাসনালি সম্পূর্ণ পুড়ে গিয়েছিল।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে খোকন চন্দ্র ছুরিকাঘাতের শিকার হন। এ সময় তিনি হামলাকারীদের চিনে ফেলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে দুর্বৃত্তরা তার শরীর ও মুখে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায়।
গুরুতর অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে তাকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়।
তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা। একজন মানুষ দোকান বন্ধ করে ঘরে ফিরছিলেন। আর মাত্র এক মিনিটের পথ বাকি ছিল। সেই পথেই নেমে এলো এমন সহিংসতা, যার ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছে না পরিবার।
ডামুড্যার কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকায় বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। কেউরভাঙ্গা বাজারসংলগ্ন এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন খোকন। তিনি তিলই এলাকার পরেশ চন্দ্র দাসের ছেলে। খোকন দাসের বোন অঞ্জনা রানী দাস বলেন, ‘প্রথমে একটা কোপ দেয়।
সঙ্গে সঙ্গে আমার ভাই মাটিতে পড়ে যায়। পরে আরও তিনটা কোপ দেয়। পেটের ভুঁড়ি বের হয়ে যায়। ওই শোয়া অবস্থায় শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে খোকন দাসের স্ত্রী সীমা দাস বলেন, ‘আমার স্বামী খুব শান্ত মানুষ ছিলেন। কারও সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না। কেন তাকে এভাবে কুপিয়ে, পুড়িয়ে মারল, আমি বুঝতে পারছি না।’ সীমা দাস বলেন, হামলাকারীরা তাদের এলাকারই। একজন রাব্বি, একজন সোহাগ। আরেকজন ছিল, নাম মনে নেই।
ভারতীয় গণমাধ্যমে মিথ্যাচার, প্রতিবাদ পরিবারের: খোকন দাসের ভাগনির জামাই প্রান্ত দাস বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে দুইজন ভারতীয় গণমাধ্যমকর্মী আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন, তারা বাংলাদেশ প্রতিনিধি। তবে আমি তাদের কোনোভাবেই এমন কোনো বক্তব্য দিইনি, যা খোকন দাসের মৃত্যুর কারণ বা ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।’
শুক্রবার দুপুরে ভারতের গণমাধ্যম ‘নিউজ ১৮ বাংলা’ অনলাইন পোর্টালে খোকন দাসের স্ত্রী সীমা দাসের বক্তব্য হিসাবে এমন তথ্য প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘আমাদের কারও সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না। কেন আমার স্বামীকে এত নৃশংসভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হলো, আমি এখনো বুঝে উঠতে পারছি না। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই এ হামলা হয়ে থাকতে পারে।’
প্রান্ত দাস বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করতে চাই, এই বক্তব্য ভিত্তিহীন। এটি সীমা দাসের বক্তব্য বলে প্রকাশ করা হয়েছে; কিন্তু অসত্যভাবে আমার মাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে দেওয়া হয়নি। এই ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে আমি প্রতিবাদ জানাই।’ খোকন দাসের ভাগিনা সৌরভ দাস জানান, পুলিশ অভিযুক্ত রাব্বি ও সোহাগকে না পেয়ে তাদের বাবাদের আটক করে। তারা বলেছেন, আইন অনুযায়ী তাদের ছেলেদের যে শাস্তি হয়, সেটাই দেওয়া হোক।
ডামুড্যা থানার ওসি মো. রবিউল হক বলেন, ঘটনার পর থেকেই আসামিদের ধরার জন্য একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। আশা করছি দ্রুতই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
